বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আমদানির দরপত্রকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, জালিয়াতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিগত সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপকভাবে আলোচিত ‘এস আলম গ্রুপ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছায়া কোম্পানিগুলোকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের সুযোগ করে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘লিয়ানেক্স’ এবং তাদের ব্যবসায়িক সহযোগী ‘মোহিত মিনারেলস’ ও ‘লোশে শিপিং’ ভুয়া ও জাল নথি ব্যবহার করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সিপিও জাহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত এস আলমের ‘এসএস পাওয়ার’ বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যখন চাপ তৈরি হয়েছে, তখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, আর্থিক ও লজিস্টিক সামর্থ্য এবং কয়লার উৎস যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগ উঠেছে, চলমান দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়নি। পর্যাপ্ত লজিস্টিক সক্ষমতা, প্রমাণিত সরবরাহ অভিজ্ঞতা কিংবা যাচাইকৃত কয়লা খনির নথি না থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জমা দেওয়া ‘মাইন এমওইউ’ এবং ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন কয়লা খনির নথির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিআইএফপিসিএল কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত মানসম্পন্ন কয়লা সরবরাহে সক্ষম ইন্দোনেশীয় খনিগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এসব নথি যাচাই করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা ই-মেইলের মাধ্যমে স্বাধীন যাচাইয়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে দরপত্রে জমা দেওয়া নথিগুলো প্রকৃত না জাল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে ওই খনি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে সক্ষম কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে যোগ্য ঘোষণা করার আগে তার জমা দেওয়া নথি এবং সংশ্লিষ্ট খনির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তার ভাষ্য, শুধু কোনো একটি নথি উপস্থাপন করলেই কয়লার উৎসের সত্যতা নিশ্চিত হয় না। যথাযথ যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দেশের কয়লা সরবরাহব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
অন্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে সেটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অভিজ্ঞতা, সরাসরি খনি-সংযোগ এবং বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত নয় বলেও মত দেন তিনি।
চলমান দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি, খনি-সংযোগ, সরবরাহ সক্ষমতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তদন্তে যদি স্বজনপ্রীতি, অসম আচরণ, তথ্য গোপন কিংবা প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে যাচাই না করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে চলমান দরপত্র বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম বলেন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে না। একটি দক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি যখন চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন কয়লা আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং প্রতিটি নথি ও সরবরাহ উৎসের স্বাধীন যাচাই নিশ্চিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

