বন্যায় নেপালে মৃত ১,২৮০, নিখোঁজ ৫ হাজার

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮০ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া দুই শ্রমিককে নয় দিন পর জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বরফ ও পাথরের ধস থেকে আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়। পরে বন্যার পানি উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে। এতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভোতে কোশি নদীর বন্যায় নেপালে ১ হাজার ২৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ৫ হাজার ৮৩ জন।

নয় দিন পর মিলল জীবনের সন্ধান

ভয়াবহ বন্যার ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে চালানো অভিযানের পর তাদের নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসেন উদ্ধারকারীরা।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভোরে উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে ক্ষীণ শব্দ পাওয়ার কথা জানান। এতে আটকে পড়া শ্রমিকরা জীবিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

উদ্ধারকারীরা ভেতরে থাকা শ্রমিকদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, ‘ভয় পাবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করছি।’ এর কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে নেপালি ভাষায় ‘হুঞ্চা’—অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ বা ‘ঠিক আছে’—শোনা যায় বলে জানান তারা।

অস্ট্রেলীয় উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্সও তখন আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দীর্ঘদিন ধরে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন।

এরপর সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে জমে থাকা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিটার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলা হয়। দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয় উদ্ধার অভিযান।

অবশেষে ডিক্সের আশাই সত্যি হয়। তার বক্তব্যের এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সুড়ঙ্গের গভীর অংশ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা।

হাজারো মানুষ যখন এখনো নিখোঁজ, তখন নয় দিন পর দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধারের ঘটনাটি চলমান উদ্ধার অভিযানে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

নিখোঁজ স্বজনদের প্রতীকী শেষকৃত্য

নিখোঁজ স্বজনদের দীর্ঘদিনেও সন্ধান না পাওয়ায় নেপালের বিভিন্ন এলাকায় পরিবারের সদস্যরা প্রতীকী শেষকৃত্য শুরু করেছেন।

‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাসুয়া জেলার পাহাড়েবেসি গ্রামে কুশ ঘাস দিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি তৈরি করে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন স্বজনেরা।

দিন যত যাচ্ছে, নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ততই কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার মানসিকভাবে স্বজনের মৃত্যুকে মেনে নিয়ে প্রতীকীভাবে শেষ বিদায়ের আয়োজন করছে।

কোন জেলায় কত মরদেহ

এনডিআরআরএমএর তথ্য অনুযায়ী, চিতওয়ান জেলা থেকে সর্বোচ্চ ৩৫৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ছাড়া নওয়ালপরাসি পূর্ব থেকে ২১৮টি এবং নওয়ালপরাসি পশ্চিম থেকে ২১২টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ভারত থেকে উদ্ধার করে নওয়ালপরাসি পশ্চিমে হস্তান্তর করা হয়েছে আরও ১৮টি মরদেহ।

নুয়াকোট থেকে ১৭৭টি, রাসুয়া থেকে ১২৭টি, গোর্খা থেকে ৭২টি, ধাদিং থেকে ৬০টি এবং তাহানু থেকে ৩৮টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তিব্বতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা

নেপালের পাশাপাশি চীনের অংশে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতেও বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

‘দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার পর্যন্ত গিরং কাউন্টিতে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪১ জন।

বন্যার তীব্রতায় রাসুয়া ও নুয়াকোটের উপত্যকাগুলোর ভূপ্রকৃতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। নদীর তীর, সড়ক এবং পরিচিত স্থাপনাগুলোর অনেক অংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

উদ্ধার অভিযানে ভারতীয় দল

চিলিমে পাওয়ার হাউসে উদ্ধারকাজে নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে ভারত থেকে যাওয়া বিশেষায়িত টানেল উদ্ধারকারী দল।

গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় রাষ্ট্রদূত উদ্ধারকারী দলের ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি কঠিন হলেও ভারত ও নেপালের উদ্ধারকারী দল সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।

বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে দুই দেশের উদ্ধারকারীরা এরই মধ্যে সুড়ঙ্গের প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়েছেন। আরও গভীরে পৌঁছাতে ভারী সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

নতুন করে বন্যার শঙ্কা

এদিকে ভোতে কোশি নদীর উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগের বন্যা পূর্বাভাস শাখার প্রযুক্তিবিদ সরস্বতী বিষ্টা জানিয়েছেন, ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর পাশাপাশি রাসুয়া ও নুয়াকোটের বিভিন্ন ছোট নদী-খালের পানিও বাড়তে পারে।

নদীর তীরবর্তী ও ভাটির এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় মাঝারি মাত্রার আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

বন্যাকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল ভয়াবহ এই দুর্যোগকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

দুর্যোগের সময় সহযোগিতা ও সংহতি প্রকাশ করায় প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

এক সাক্ষাৎকারে খানাল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বিশ্বের বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব দেশের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নেপাল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতা ও সমন্বয় অব্যাহত রাখবে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ত্রাণ তহবিলে পকেটমানি দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পর্যায় থেকে ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর পাশাপাশি নেপালের স্কুলশিক্ষার্থীরাও এগিয়ে এসেছে।

অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের পকেটমানির একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে।

তিব্বত থেকে ফিরেছেন আড়াই হাজার নেপালি

গত ২৬ আগস্ট রাসুয়ায় বন্যা শুরু হওয়ার পর তিব্বতে আটকা পড়া ১১৪ জন নেপালি নাগরিককে উদ্ধার করেছে চীন। বৃহস্পতিবার নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাতোপানি সীমান্ত দিয়ে তাদের দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দেশে ফেরার পর এসব নাগরিককে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হবে। সেখান থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে নেপালের কর্তৃপক্ষ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, তিব্বত থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ নেপালি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। আরও প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নেপালে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

হিমবাহ গলে বাড়ছে ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ঝুঁকি

সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর তিব্বত মালভূমির হিমবাহ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চীনের জলবায়ুবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, তিব্বত মালভূমির হিমবাহগুলো ভবিষ্যতে আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ের মতো আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা আরও ঘটতে পারে।

চীনের ন্যাশনাল ক্লাইমেট সেন্টারের উপপরিচালক গাও রং জানান, গত ৬০ বছরে তিব্বত মালভূমির হিমবাহের আয়তন প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রায় ৭ হাজার ছোট হিমবাহ সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সবখবর/ নিউজ ডেস্ক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top