ব্রাজিলের সাও পাওলো উপকূল থেকে কয়েক দশ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের মাঝে রয়েছে ছোট্ট একটি দ্বীপ। চারপাশে নীল জল আর দ্বীপজুড়ে ঘন সবুজ বন—দূর থেকে দেখলে জায়গাটিকে মনে হতে পারে শান্ত কোনো পর্যটন গন্তব্য। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ এই দ্বীপের অন্যতম প্রধান বাসিন্দা বিশ্বের অন্যতম বিষধর সাপ।
দ্বীপটির নাম ইলহা দা কুইমাদা গ্রান্ডে (Ilha da Queimada Grande)। ভয়ংকর সাপের আধিক্যের কারণে এটি বিশ্বজুড়ে ‘স্নেক আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত। প্রায় ৪৩ হেক্টর আয়তনের এই দ্বীপটি ব্রাজিলের সাও পাওলো উপকূল থেকে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এই দ্বীপে পাওয়া যায় গোল্ডেন ল্যান্সহেড (Bothrops insularis) নামের বিশেষ এক প্রজাতির পিট ভাইপার। পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানে প্রাকৃতিকভাবে এই সাপের দেখা মেলে না। অর্থাৎ কুইমাদা গ্রান্ডেই তাদের একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থল।
বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, দ্বীপটিতে গোল্ডেন ল্যান্সহেডের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার থেকে ৪ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তবে এ সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। ২০০২ সালের একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণায় প্রায় ২ হাজার ৩০০টি সাপের সম্ভাব্য জনসংখ্যার হিসাব পাওয়া গিয়েছিল। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত ‘প্রতি বর্গমিটারে কয়েকটি সাপ’ ধরনের নির্দিষ্ট দাবি পুরো দ্বীপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ সাপের উপস্থিতি দ্বীপের বিভিন্ন অংশে সমান নয়।
কেন দ্বীপটিতে এত সাপ?
বর্তমানের এই বিচ্ছিন্ন পরিবেশের পেছনে রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। শেষ বরফযুগের পর সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়লে মূল ভূখণ্ড থেকে কুইমাদা গ্রান্ডে আলাদা হয়ে যায়। দ্বীপে আটকে পড়ে সাপের একটি ছোট জনগোষ্ঠী।
মূল ভূখণ্ডের তুলনায় দ্বীপটির পরিবেশ ছিল একেবারেই আলাদা। সেখানে বড় ধরনের স্থলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি নেই। ফলে সাধারণত ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করা সাপগুলোকে নতুন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হয়।
দ্বীপে নিয়মিত আসা পরিযায়ী পাখি তাদের খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। গাছের ডালে থাকা পাখিকে দ্রুত আক্রমণ করে শিকার করার জন্য গোল্ডেন ল্যান্সহেডের বিষও বিশেষভাবে কার্যকর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এভাবেই দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে টিকে থাকতে গিয়ে সাপগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে।
মানুষের বসতি নেই
একসময় দ্বীপটিতে বাতিঘরের কর্মী এবং তাঁর পরিবার বসবাস করতেন। পরে বাতিঘরটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ায় মানুষের স্থায়ী বসবাসের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে কুইমাদা গ্রান্ডে জনবসতিহীন। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশও অনুমোদিত নয়। ব্রাজিলের নৌবাহিনী বাতিঘরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে। বিশেষ অনুমতি নিয়ে গবেষকেরা সেখানে যেতে পারেন।
দ্বীপটিকে ঘিরে ইন্টারনেটে নানা রোমাঞ্চকর ও ভয়ংকর গল্প রয়েছে। কোথাও কোথাও এমন দাবি করা হয়, দ্বীপে পা রাখলেই অসংখ্য সাপ চারদিক থেকে ছুটে আসে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা নাটকীয় নয়। সাপের ঘনত্ব দ্বীপের সব এলাকায় একই রকম নয়; বিশেষ করে বনাঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বেশি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দ্বীপটি সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ। অত্যন্ত বিষধর সাপের পাশাপাশি দুর্গম পরিবেশের কারণে সেখানে অবাধে প্রবেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত উপস্থিতি বিরল প্রজাতিটির জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ভয়ংকর হলেও বিপন্ন
গোল্ডেন ল্যান্সহেড শুধু বিষধর বলেই আলোচিত নয়, সংরক্ষণবিদদের কাছেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রজাতিটি Critically Endangered বা ‘চরম সংকটাপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত।
এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—পুরো প্রজাতিটির প্রাকৃতিক আবাস মাত্র একটি ছোট দ্বীপে সীমাবদ্ধ। ফলে ওই দ্বীপের পরিবেশে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটলে তার প্রভাব পুরো প্রজাতির ওপর পড়তে পারে। অবৈধভাবে সাপ সংগ্রহ এবং আবাসস্থলের পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
২০০৮ সালের একটি গবেষণায় গোল্ডেন ল্যান্সহেডের সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং অবৈধভাবে সাপ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তাই প্রজাতিটির ওপর নিয়মিত নজরদারি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা।
বিবর্তনের জীবন্ত উদাহরণ
কুইমাদা গ্রান্ডের গুরুত্ব কেবল ভয়ংকর সাপের উপস্থিতির কারণে নয়। জীববিজ্ঞানীদের কাছে এটি বিচ্ছিন্ন পরিবেশে বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে একটি ছোট সাপের জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে টিকে থেকেছে। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা এমন বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে, যা তাদের মূল ভূখণ্ডের আত্মীয়দের থেকে আলাদা করেছে।
তাই ‘স্নেক আইল্যান্ড’কে শুধু আতঙ্কের দ্বীপ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে প্রকৃতির কঠিন বাস্তবতা, বিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং একটি বিরল প্রজাতিকে সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

